তারাবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতির পাহাড় — ভুয়া সনদ, জমি আত্মসাৎ, বেতন বানিজ্য ও শিক্ষার্থী হয়রানির অভিযোগ।

তারাবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতির পাহাড় — ভুয়া সনদ, জমি আত্মসাৎ, বেতন বানিজ্য ও শিক্ষার্থী হয়রানির অভিযোগ।

বিশেষ প্রতিনিধি | ক্রাইমলেন্স24

 

“শিক্ষক সমাজ ও দেশ গড়ার কারিগর”—এই মহৎ পেশা যদি দুর্নীতির আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়, তবে প্রজন্মের ভবিষ্যৎ অন্ধকার ছাড়া আর কিছু নয়। এমনই এক চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির চিত্র পাওয়া গেছে ঝালকাঠি জেলার কাঠালিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী তারাবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ শহিদুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে প্রধান শিক্ষক পদে থেকে তিনি গড়ে তুলেছেন দুর্নীতির এক বিশাল সাম্রাজ্য। জাল সার্টিফিকেটে চাকরি, স্কুলের জমি আত্মসাৎ, বই বিক্রি, পকেট কমিটি, নিয়োগ বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের হয়রানি, বেতন আত্মসাৎ—কোন অপরাধই বাদ নেই তার তালিকায়।

**জাল সনদে চাকরি, অজ্ঞাত শিক্ষাগত যোগ্যতা

অনুসন্ধানে জানা যায়, শহিদুল ইসলাম খান ১৯৮১ সালে যে “কৃষি শাখা” উল্লেখিত এসএসসি সার্টিফিকেট দেখিয়েছেন, এমন কোনো শাখা বাংলাদেশে কখনো ছিল না। তার উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক সনদেরও কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে যে বি.এসসি সার্টিফিকেট ব্যবহার করছেন, সেটিও সন্দেহজনক ও অগ্রহণযোগ্য।

**দানকৃত স্কুলের জমি আত্মসাৎ

১৯৯৪ সালে বিদ্যালয়ের নামে স্থানীয় দাতা প্রফুল্ল কুমার হালদার প্রায় ৪৮ শতক জমি দান করেন। অথচ ২০০৮ সালে ওই জমি প্রধান শিক্ষক নিজেকে শনাক্তকারী দেখিয়ে অন্যত্র হস্তান্তর করেন। এই জমি কেলেঙ্কারি নিয়ে ২০১৯ সালে দৈনিক যুগান্তর, বরিশালের বাণী, bdnews24-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

**বই বিক্রি থেকে বেতন আত্মসাৎ পর্যন্ত

২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর বিনামূল্যের সরকারি বই বিক্রির সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন তিনি। শিক্ষা বোর্ড তাকে শোকজ নোটিশ পাঠালেও বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়।

অভিযোগ রয়েছে—শিক্ষকদের বেতন, বোনাস ও টিউশন ফি এবং উপবৃত্তির আত্মসাৎ করে তিনি বিপুল অর্থ সম্পদ অর্জন করেছেন। বিদ্যালয়ের ল্যাপটপ, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, আসবাবপত্র পর্যন্ত তার ব্যক্তিগত ব্যবহারে চলে গেছে।

**১৮ লক্ষ টাকায় তিন শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্য

২০২৪ সালের মিটিংয়ে তিনি তিনটি শিক্ষক পদ শূন্য দেখিয়ে এনটিআরসি-তে আবেদন করেন। অথচ তখন ইংরেজি শিক্ষক আব্দুল হামিদ হাওলাদার কর্মরত ছিলেন। পরে ওই তিন পদে রেজওয়ান (ঝিনাইদহ), স্নিগ্ধা আক্তার সুমা (বগুড়া) ও হাসান (কাঠালিয়া) নামে তিনজনকে ১৮ লক্ষ টাকার বিনিময়ে নিয়োগের তদবির চালান শহিদুল ইসলাম খান।

**পকেট কমিটি ও স্বজনপ্রীতি

বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটিতেও দেখা যায় স্বজনপ্রীতির ছাপ। স্থানীয় গণ্যমান্যদের বাদ দিয়ে নিজের চাচাতো ভাই রুস্তম আলী খানকে সভাপতি করে পকেট কমিটি গঠন করেন তিনি। অত্র বিদ্যালয়ের কেরানী মনির ও পিয়ন শামীমকে অবৈধভাবে নিয়োগ দেন, যাদের থেকে তিনি মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

**সাংবাদিক ও অভিভাবক হয়রানি

অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা তথ্য সংগ্রহে গেলে স্থানীয় অভিভাবক ও ভুক্তভোগীরা অভিযোগ নিয়ে তাদের ঘিরে ধরেন। স্থানীয় ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন জানান, স্কুলের দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় প্রধান শিক্ষক তার দোকানে আগুন ধরিয়ে দেন, যার ক্ষতি প্রায় ১০ লক্ষ টাকার।

সাংবাদিকরাও তদন্তে গেলে শহিদুল ইসলাম খান ফোনে হুমকি দিয়ে বলেন—

“আমি থাকলে সাংবাদিকদের বেঁধে বাথরুমে আটকে রাখতাম!”

তিনি আরও দাবি করেন, “আমি এখন এসপির অফিসে বসে আছি, এআইজি আমার ভাই”—এই বলে ভয় দেখান এবং তদন্ত বন্ধের বিনিময়ে ঘুষ প্রস্তাব দেন।

**শিক্ষা অফিসের তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে

অনুসন্ধানী দল পুরো প্রমাণ ঝালকাঠি জেলা শিক্ষা অফিসে জমা দিলে শিক্ষা অফিসার নিজে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটি বিদ্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে বেতন আত্মসাৎ, ভুয়া সনদ, জমি আত্মসাৎসহ একাধিক অনিয়মের প্রমাণ পান।

প্রধান শিক্ষককে দুই দিনের মধ্যে কাগজপত্রসহ হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

** জনগণের দাবি — দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি

স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষক, ও সচেতন মহল বলেন—

“একজন দুর্নীতিবাজ শিক্ষক কখনোই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়তে পারে না।”

তাদের দাবি—মাত্র ছয় মাস পর অবসরে যাওয়ার আগে যেন দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং শহিদুল ইসলাম খানকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হয়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় যদি দুর্নীতির রাজত্ব চলে, তবে শিক্ষা হবে অর্থের ব্যবসা। তারাবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ শহিদুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে তদন্ত এখন প্রশাসনের হাতে।এবার দেখার বিষয় — ন্যায় বিচার কতটা দ্রুত আসে, আর শিক্ষা ব্যাবস্হা আবার কবে আলোর মুখ দেখে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *