পরিবার পরিকল্পনায় রেজিস্টার কেলেঙ্কারি: বহাল তবিয়তে নাটের গুরুরা
স্টাফ রিপোর্টার | বিথী খাঁন
সূত্র: ক্রাইমলেন্স 24
সরকারি অর্থে কেনাকাটার নামে কোটি টাকার দুর্নীতি— এমনই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চুক্তির সব পণ্য না পেয়েও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পুরো বিল পরিশোধ করা হয়। অথচ পণ্যের বড় একটি অংশ অধিদফতর এখনো বুঝে পায়নি।
অধিদফতরের তৎকালীন পরিচালক (এমআইএস) মো. তসলিম উদ্দিন খান এবং সাবেক পরিচালক মো. শাহাদাত হোসাইনের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে। তারা নথিপত্রে ‘মালামাল বুঝে পেয়েছি’ বলে প্রত্যয়ন দেন, অথচ বাস্তবে অধিকাংশ মালামাল সরবরাহ হয়নি। এর বিনিময়ে কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
চুক্তির ছয় দিনের মধ্যেই বিল পরিশোধ!
২০১৮ সালের ২৪ জুন পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর “নিপুণ প্রিন্টিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড”-এর সঙ্গে একটি বড় চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী, ৩০ হাজার পিস পরিবার কল্যাণ সহকারী রেজিস্টার (৯ম সংস্করণ), ১০ হাজার সাপ্লিমেন্টারি রেজিস্টার এবং ৪৯ লাখ ৯৯ হাজার ৮৭২ পিস বিভিন্ন ধরনের এমআইএস ফরম সরবরাহের কথা ছিল।
কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র ছয় দিনের মাথায়, ৩০ জুন, সব মালামাল না পেয়েই পুরো বিল পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়। তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তসলিম উদ্দিন খান এই বিল অনুমোদন করেন। অথচ চুক্তি অনুযায়ী মালামাল সরবরাহের সময়সীমা ছিল আট সপ্তাহ।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৪৫০০ পিস সহকারী রেজিস্টার, ২৫০০ পিস সাপ্লিমেন্টারি রেজিস্টার এবং ৩৯ হাজার পিস এমআইএস ফরম কখনোই সরবরাহ করা হয়নি। পরবর্তীতে অধিদফতরের অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে স্বয়ং তসলিম উদ্দিন খানের স্বাক্ষরিত পত্রে এ ঘাটতির কথা উল্লেখ ছিল।
মেশিন সরবরাহেও একই অনিয়ম
একই অর্থবছরে তসলিম উদ্দিন খান “ড্রাগস অ্যান্ড স্টোরস” ইউনিটের দায়িত্বে ছিলেন। এ সময় ‘S.H Surgical’ নামে একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৫০০ পিস অটোক্লেভ মেশিন কেনার চুক্তি হয়। কিন্তু ৭০টি মেশিন না পেয়েও তিনি প্রত্যয়ন দেন যে সব মেশিন পাওয়া গেছে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি চুক্তিমূল্য দুই কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা পুরোপুরি তুলে নেয়।
অধিদফতরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তসলিম উদ্দিনের সময়েই বেশিরভাগ সরবরাহ চুক্তি এমনভাবে করা হয়েছিল যে, বিল আগে দেওয়া হতো, পণ্য আসতো পরে বা আসতোই না।”
রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়া
সূত্রমতে, অভিযোগ ওঠার পরও এসব কর্মকর্তা বহাল তবিয়তে ছিলেন। কারণ তারা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা শাজাহান খান ও সাবেক সংসদ সদস্য ডা. হাবিবে মিল্লাতের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিতেন। কেউ তাঁদের বিরুদ্ধে কথা বললে বদলির ভয় দেখানো হতো।
একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “তসলিম উদ্দিন নিজেকে ডা. হাবিবে মিল্লাতের আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিতেন। আবার শ্বশুরবাড়ি মাদারীপুর হওয়ায় শাজাহান খানের নামও ব্যবহার করতেন। ফলে অধিদফতরের ভিতরে কেউ তাঁকে প্রশ্ন করার সাহস পেত না।”
তদন্ত কমিটি, কিন্তু ফল শূন্য
২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে বলা হয়— সরবরাহ প্রক্রিয়া ও অর্থপ্রদান পদ্ধতি পর্যালোচনা করে জড়িতদের শনাক্ত করতে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক চাপে তদন্ত তেমন অগ্রসর হয়নি।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর, অধিদফতরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা সাহস সঞ্চয় করে নতুন করে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন। তারা স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ও সিনিয়র সচিবের কাছে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছেন।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
অভিযুক্ত তসলিম উদ্দিন খান বলেন, “এসব অভিযোগ কারা করছে জানি না। আমার এসব ঘটনার কথা স্মরণ নেই। অফিসে এলে বিস্তারিত বলা যাবে।”
অন্যদিকে মো. শাহাদাত হোসাইন বলেন, “দুই বছর আগে অবসরে গেছি। চুক্তি সংক্রান্ত কাগজপত্র সামনে থাকলে বিস্তারিত বলতে পারতাম। তবে কাজটি নিয়ম অনুযায়ীই হয়েছে বলে মনে করি।”
মাঠ পর্যায়ে ক্ষতি
অধিদফতরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানান, পর্যাপ্ত রেজিস্টার ও ফরম না থাকায় তখন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। “অনেক উপজেলায় পরিবার কল্যাণ সহকারীরা খালি হাতে কাজ করতেন,” বলেন এক কর্মকর্তা।
সমাপ্তি
অভিযোগকারীরা বলছেন, শুধু এই একটি কেলেঙ্কারি নয়— তসলিম উদ্দিনের সময়কালে আরও বহু অনিয়মের প্রমাণ মেলে প্রশাসনের পুরনো ফাইলগুলো খুঁজলে। তবে এখনো পর্যন্ত অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সূত্র: ক্রাইমলেন্স 24
চলমান -২